ঐতিহাসি ক লালবাগ কেল্লা
রাশেদুল ইসলাম সাজ্জাদ :
আমাদের রাজধানী শহর ঢাকা। এই ঢাকা শহরের পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকায় ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লা অবস্থিত। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, লালবাগ কেল্লার আসল নাম ছিল কিল্লা আওরঙ্গবাদ। মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব এর তৃতীয় পুত্র যুবরাজ আজম শাহ বাংলার সুবেদার হয়ে ১৬৭৮ সালে ঢাকায় আসেন।
তিনি বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ‘কিল্লা আওরঙ্গবাদ' নামে একটি প্রাসাদ দূর্গ নির্মাণে হাত দেন। কিন্তু তিনি এই দুর্গটির নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করতে পারেননি। কারণ ১৬৭৯ সালে মারাঠাদের মোকাবিলার জন্য সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে দিল্লী ডেকে পাঠান। ফলে প্রাসাদ দুর্গটির নির্মাণ কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই তাকে ঢাকা ত্যাগ করতে হয়।
১৬৮০ সালে শায়েস্তা খান দ্বিতীয়বার বাংলার সুবেদার হয়ে ঢাকায় আসেন। সুবেদার শায়েস্তা খান ছিলেন একজন দক্ষ শাসক, বিচক্ষণ কূটনীতিক ও বীরযোদ্ধা। তিনি দুই দফায় সুদীর্ঘ ২৪ বছর বাংলায় সুবেদারের দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর শাসনামলেই আরাকান জলদস্যুদের পরাজিত করে চট্টগ্রাম বন্দর মুক্ত করেন তিনি। তার শাসনামলেই বাংলায় ব্যাপক সমৃদ্ধি ঘটেছিল। তিনি এ দেশে বহু জনহিতকর কাজও করেন। তবে অন্য সব সাফল্যের সংগে এই লালবাগ কেল্লার ভিতরে পরী বিবির সমাধিসৌধ তাকে অমর করে রেখেছে। তবে তৎকালীন সময় দুর্গ সাধারণ নির্মিত হতো আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। তবে লালবাগ দুর্গের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ছিল কিছুটা ভিন্ন। যুবরাজ আজম শাহের উৎসাহ ছিল নতুন নতুন স্থাপত্য নির্মাণের। সে রকমই একটি প্রয়াস লালবাগ দুর্গ। তবে যুবরাজ আজম শাহ তার পিতাকে সম্মান দেখিয়ে এটির নামকরণ করেন ‘কিল্লা আওরঙ্গবাদ। ১৬৮০ সালে সুবেদার শায়েস্তা খান ঢাকা এলে সম্রাট আওরঙ্গজেব ‘কিল্লা আওরঙ্গবাদের স্বত্ব দান করেছিলেন বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খানকে। যুবরাজ আজম শাহ তাকে ‘কিল্লা আওরঙ্গবাদ' প্রাসাদের নির্মাণ কাজ শেষ করার জন্য অনুরোধ করেন। সুবেদার শায়েস্তা খান ব্যক্তিগতভাবে এর মালিক হওয়ায় আবার নতুন করে দুর্গের নির্মাণ কাজ শুরু করেন এবং তিনিই তা সমাপ্ত করেন। এছাড়া তিনি দুর্গটির নাম পরিবর্তন করে ‘লালবাগ দুর্গ' করেন।
আবার অনেকের মতে, সুবেদার শায়েস্তা খান ব্যক্তিগতভাবে এই দুর্গের মালিক হওয়া সত্ত্বেও এ দুর্গটির প্রতি তেমন কোনো আগ্রহ বোধ করেননি।
এর কারণ, জনশ্রুতি অনুযায়ী, বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খান লালবাগ দুর্গের নির্মাণ কাজে হাত দিলে এর কিছুদিন পর তাঁর অতি আদরের কন্যা পরীবিবির (ইরান দূখত) মৃত্যু হয়। কন্যার মৃত্যুতে তিনি গভীরভাবে শোকাহত হন। তাছাড়াও কন্যা পরীবিবির বিয়ে হওয়ার কথা ছিল যুবরাজ আজম শাহের সংগে। তাই সুবেদার শায়েস্তা খান ভেবেছিলেন, দুর্গটি অপয়া। আর এইজন্য তিনি লালবাগ দুর্গের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেননি। লালবাগ দুর্গের আয়তন প্রায় ১৯ একর। এই ঐতিহাসিক লালবাগ দুর্গটি এদেশের অন্যতম একটি মনোমুগ্ধকর স্থাপনা ও শিল্পকলার নিদর্শন। এর ভিতরে রয়েছে দরবারগৃহ, পরীবিবির সমাধিসৌধ, হাম্মাম খানা, পুকুর, মাটির ঢিবি, দুর্গ, মসজিদ, পানির নল, ফোয়ারা প্রভৃতি। সুবেদার শায়েস্তা খান দুর্গের কাজ বন্ধ করে দেন। তার পরিবর্তে দরবার হল এবং দুর্গের মাঝখানে পরীবিবিকে সমাহিত করে তার ওপর দৃষ্টিনন্দন একটি সমাধিসৌধ নির্মাণ করেন। শোককে সৌন্দর্যে পরিণত করেন। পরীবিবির সমাধিসৌধের নির্মাণশৈলী অনুপম ও নির্মাণসামগ্রী অতি মূল্যবান।
গোলাপী রঙের এই সৌধটি কালো পাথরে বাঁধানো একটি অনুচ্চ প্লাটফর্মের ওপর নির্মিত। চারকোণে চারটি অষ্টকো উঁচু মিনার আছে। মিনারের শীর্ষ ছোট গম্বুজ দ্বারা সুশোভিত। সৌধের ঠিক মাঝখানে একটি গম্বুজ আছে। সৌধের চারিদিকেই আছে একটি করে দরজা। খাঁজকাটা মিনার দিয়ে দরজাগুলো বেষ্টিত। পরী বিবির সমাধি সৌধের বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে এর ভেতরের সৌন্দর্য বেশি মনোমুগ্ধকর। সৌধের ভেতরে মার্বেল পাথর, বেলে পাথর ও কালো পাথরের কারুকাজ বিস্ময়কর। এই পরীবিবির সৌধের ভেতরে আছে ছোট বড় নয়টি কক্ষ। তবে এর কেন্দ্রীয় কক্ষটি বেশ বড়। আর এই কক্ষের মাঝে রয়েছে পরীবিবির সমাধি। এই সমাধি কক্ষের চারদিকে রয়েছে চারটি দরজা। পরীবিবির সমাধি দক্ষিণ-পূর্ব কোণের কক্ষে ছোট আকারের একটি সমাধি আছে। এই সমাধিটি সুবেদার শায়েস্তা খানের পালিত কন্যার। সৌধের ভেতরে আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। শায়েস্তা খান সুবেদারি পদ থেকে অবসর নিয়ে ১৬৮৮ সালে আগ্রা গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তবে লালবাগ দুর্গ যখন লালবাগ অঞ্চলে নির্মিত হয় তখন বুড়িগঙ্গা নদীর যৌবনকাল। ফলে বুড়িগঙ্গা বয়ে যেত এই দুর্গের পাশ দিয়ে। দুর্গটি প্রাচীরবেষ্টিত। কয়েকটি তোরণ ছাড়া দুর্গের চৌহদ্দির মধ্যে যা রয়েছে তা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্গটির পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় দুই হাজার ফুট এবং উত্তর-দক্ষিণে প্রায় আটশ ফুট চওড়া। বুড়িগঙ্গা নদী বয়ে যেত এর দক্ষিণ দিক দিয়ে। কালের বিবর্তনে এখন বুড়িগঙ্গা নদী সরে গেছে। এই লালবাগ দুর্গের দুর্গ ভবনের দক্ষিণ দিকে এর প্রধান তোরণ বা প্রবেশ পথ। যদিও এটি শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে সমাপ্ত হয়নি। তবে তোরণটি এখনো পর্যন্ত তেমনি আছে। কিন্তু এ দুর্গটির নির্মাণ কাজ এতই শৈল্পিকতাপূর্ণ যে, এর অসম্পূর্ণতা অতি সহজে ধরা যায় না। দুর্গের মূল ভবনটি তিন তলা। এই তিন তলা ভবনের নিচ তলার মাঝখান দিয়ে বের হওয়ার এবং প্রবেশ করার একটি পথ আছে। এখানে প্রবেশ পথে আরেকটি তোরণ আছে। সেটিই এখনো সদর তোরণ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। অর্থাৎ দর্শকরা এ তোরণ দিয়েই মূল ভবনে প্রবেশ করেন। অতি মূল্যবান সুদৃশ্য পাথর দ্বারা এ তোরণটি নির্মিত। এ দুর্গটির মূল ভবনের পাশেই আরো একটি দো-তলা ভবন রয়েছে। যতোদূর জানা যায় যে, এই ভবনের ওপর তলায় ছিল দরবারগৃহ। এখানেই তৎকালীন সময় রাজ্যের বিচারসহ রাজ্যের যাবতীয় রাজকার্য চলতো। এর নিচ তলায় ছিল হাম্মাম খানা বা গোসলখানা। এই হাম্মাম খানায় তৎকালে রাজ পরিবারের সবাই, বিশেষ করে মহিলারা গোসল করতেন। এমনকি সে সময় গোসলের জন্য বিভিন্ন উত্তাপের গরম ও ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা থাকত। হাম্মাম খানায় সর্ব সময় সুগন্ধিতে ভরপুর থাকত। এছাড়া শরীরে মাখার জন্য বিভিন্ন ধরনের বিদেশী সুগন্ধিও সেখানে মজুদ থাকত।
এই দুর্গের ভিতরে একটি পুকুর ছিল। এই পুকুরটি কখনো গোসল অথবা এ ধরনের কোনো কাজে ব্যবহৃত হতো না, যদিও এ উদ্দেশ্যে এ পুকুরটি খনন করা হয়েছিল। সুবেদার শায়েস্তা খান এখান থেকে চলে যাবার পরপরই ঢাকার রাজনৈতিক গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ১৭০৪ সালে বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকেই এই লালবাগ দুর্গটি অবহেলার শিকার হয়।
১৮৫৩ সালে ঢাকার পুরানা পল্টন থেকে সেনানিবাস স্থানান্তর করে লালবাগ দুর্গটি ব্যবহার করা হয়। ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত সেনানিবাস এখানে ছিল। এখানে ১৮৫৭ ও ১৯৪৮ সালে ঘটেছিল দুটি রক্তাপ্লুত ঘটনা। যা লালবাগ অঞ্চলের সর্বশ্রেণীর মানুষ এখনও স্মরণ করে। যদিও কালের পরিবর্তনে এই দুর্গটি অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ছিল দীর্ঘ বছর। সেই সঙ্গে পরীবিবি সমাধিসৌধ অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকে। ১৮৯৭ সালে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের পরও পরীবিবির সমাধিসৌধ বিস্ময়করভাবে টিকে থাকে। সুদীর্ঘ বছর পর লালবাগ দুর্গ সংস্কার করে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। সাপ্তাহিক বন্ধ : রোববার। সোমবার খোলা থাকে দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। মঙ্গল থেকে শনিবার খোলা থাকে সকাল নয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত (এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর)। জুমার নামাজের জন্য শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে দু'টা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। সরকারি ছুটির দিন বন্ধ থাকে। প্রবেশ মূল্য : জনপ্রতি ১০ টাকা। লালবাগ দুর্গটি মোঘল স্থাপত্যের অন্যতম কীর্তি একটি ঐতিহাসিক প্রাচীন স্থাপনা হিসেবে এখনো দর্শকদের আকৃষ্ট করে। প্রতিদিন দেশ ও বিদেশের বহু দর্শক এটি দেখতে আসেন। তারা এ দুর্গটির নির্মাণ শৈলী ও কারুকার্য দেখে মুগ্ধ হন।